বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১২:১০ অপরাহ্ন

প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে ডেমোক্র্যাটরা, চাপে পড়বেন ট্রাম্প

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬
  • ৪ বার

আগামী বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে প্রয়োজনীয় আসনে জয় পেতে যাচ্ছে ডেমোক্র্যাটরা। এমন পূর্বাভাস দিয়েছে সিবিএস নিউজ। এর ফলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আইন প্রণয়নের কর্মসূচি কার্যত থমকে যাবে। একই সঙ্গে হোয়াইট হাউসে তার শেষ দুই বছরে প্রশাসন ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড নিয়ে একের পর এক তদন্তের মুখে পড়তে পারেন তিনি।

জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ ডেমোক্র্যাটদের জয় পেতে সহায়তা করেছে। এর ফলে চার বছর ধরে রিপাবলিকানদের অল্প ব্যবধানে থাকা সংখ্যাগরিষ্ঠতার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। এই সময়ে রিপাবলিকানরা আইন প্রণয়নের বড় একটি অংশের ক্ষমতা ট্রাম্প প্রশাসনের হাতে ছেড়ে দিয়েছিল।

তবে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কতটা বড় হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বেশ কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে ভোট গণনা চলছে।

জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেসের অধিবেশন শুরু হলে সমন জারির ক্ষমতা পাওয়ার পর ব্যাপক তদন্তের পরিকল্পনা করছেন প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাটরা। তারা প্রেসিডেন্ট ও তার পরিবারের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড, প্রশাসনের অভিবাসনবিষয়ক অভিযান, জেফরি এপস্টিন কেলেঙ্কারি, ট্রাম্পের ক্ষমা প্রদানের সিদ্ধান্ত এবং দেশটির রাজধানীজুড়ে তড়িঘড়ি করে নির্মাণ করা বিভিন্ন প্রকল্প খতিয়ে দেখতে পারেন।

প্রতিনিধি পরিষদের তদারকি ও বিচারবিষয়ক কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য যথাক্রমে ক্যালিফোর্নিয়ার রবার্ট গার্সিয়া ও মেরিল্যান্ডের জেমি রাসকিন এই তদন্ত কার্যক্রমের নেতৃত্ব দিতে পারেন। কংগ্রেসের তদারকির অনুরোধ নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে তাদের সংঘাত প্রায় নিশ্চিত। এমন বিরোধ শেষ পর্যন্ত আদালত পর্যন্ত গড়াতে পারে।

সরকারি ব্যয়ের ওপরও নিয়ন্ত্রণ থাকবে ডেমোক্র্যাটদের। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য দিতে বা অন্যান্য অনুরোধ মানতে বাধ্য করার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের অগ্রাধিকার পাওয়া বিভিন্ন খাতে অর্থ বরাদ্দ আটকে দিতে পারেন তারা।

ট্রাম্পকে তৃতীয়বারের মতো অভিশংসনের চেষ্টা করা হবে কি না, সেটিও এখন বড় প্রশ্ন। প্রতিনিধি পরিষদের সংখ্যালঘু নেতা হাকিম জেফরিস বলেছেন, ‘আমরা কোনো কিছুই বাতিল করিনি, আবার কোনো কিছু চূড়ান্তও করিনি।’ ট্রাম্প অবশ্য সতর্ক করে বলেছেন, ডেমোক্র্যাটরা তাকে অভিশংসনের চেষ্টা করবে বলে তিনি মনে করছেন। তবে এই প্রক্রিয়ায় যেতে খুব বেশি আগ্রহী নন ডেমোক্র্যাট নেতারা।

জেফরিস জানিয়েছেন, ডেমোক্র্যাটদের কর্মসূচিতে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। তাদের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে ট্রাম্পের ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে মেডিকেইডে করা কাটছাঁট প্রত্যাহার, গত বছর মেয়াদ শেষ হওয়া সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা আইনের বিমা প্রিমিয়াম করছাড়ের মেয়াদ বাড়ানো, ইরান যুদ্ধ বন্ধ করা এবং প্রেসিডেন্টের আরোপ করা শুল্ক প্রত্যাহার।

মধ্যবর্তী নির্বাচন ঐতিহাসিকভাবেই ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দলের জন্য কঠিন। আমেরিকান প্রেসিডেন্সি প্রজেক্টের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৩৪ সালের পর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বছর ছাড়া অন্য সময়ে মাত্র তিনবার ক্ষমতাসীন দলের প্রতিনিধি পরিষদে আসন বেড়েছে।

জনপ্রিয়তাহীন ইরান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার কোনো কৌশল না থাকায় ট্রাম্পের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। যুদ্ধটি ইতিমধ্যে নবম মাসে গড়িয়েছে। পাশাপাশি বাণিজ্যিক সংঘাত শুরু করায় মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। এর মধ্যে অনেক মার্কিন নাগরিকের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও জ্বালানির খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

হোয়াইট হাউসে বিশাল নৃত্যকক্ষ নির্মাণের পাশাপাশি ওয়াশিংটনে অন্যান্য সংস্কার ও নির্মাণকাজ নিয়েও ট্রাম্পের অতিমাত্রায় আগ্রহ ভোটারদের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগের সঙ্গে স্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি করেছে। ট্রাম্প বেশির ভাগ সময়ই মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগকে গুরুত্ব দেননি। বরং উচ্চমূল্যের জন্য তার পূর্বসূরিকে দায়ী করেছেন।

নির্বাচনী প্রচারের শেষ কয়েক সপ্তাহে ডেমোক্র্যাটরা জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়কে সামনে রেখে প্রচার চালিয়েছেন। ওয়াশিংটনের দুর্নীতির সঙ্গে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির সম্পর্কও তুলে ধরেছেন তারা। সিবিএস নিউজের সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখলে সরকারি দুর্নীতি আরও বাড়বে বলে মনে করেন অধিকাংশ ভোটার। ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে বিষয়টি তাদের সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলেছে।

অন্যদিকে রিপাবলিকানরা নির্বাচনকে ‘সাধারণ বুদ্ধিবিবেচনা’ ও ‘উন্মাদনার’ মধ্যে বেছে নেওয়ার লড়াই হিসেবে তুলে ধরেছেন। এ ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী প্রার্থীদের জয়কে উদাহরণ হিসেবে দেখিয়েছেন তারা।

প্রেসিডেন্টের আহ্বানে টেক্সাস ও ফ্লোরিডাসহ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্বিন্যাস করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের দলের জন্য সুবিধাজনক আসন বাড়িয়ে নিম্নকক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা। তবে সাতটি অঙ্গরাজ্যে ১৫টি অতিরিক্ত আসন তৈরির উদ্যোগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রক্ষায় খুব একটা কাজে আসেনি। এর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ক্যালিফোর্নিয়ায় নির্বাচনী এলাকার সীমানা নতুন করে নির্ধারণ করেন ডেমোক্র্যাটরা। এতে পাঁচটি আসন রিপাবলিকানদের জন্য কম সুবিধাজনক হয়ে ওঠে।

প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার হিসেবে মাইক জনসনের মেয়াদজুড়েই রিপাবলিকানদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ লেগে ছিল। প্রেসিডেন্টের বারবার অবস্থান পরিবর্তনের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। বিভক্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ দলকে সামলাতে গিয়ে লুইজিয়ানার এই রিপাবলিকান নেতা রসিকতা করে বলেছিলেন, স্পিকারের চেয়ে তিনি যেন বেশি একজন মনোচিকিৎসক।

গুরুত্বপূর্ণ ভোটে দলের অনিচ্ছুক সদস্যদের সমর্থন আদায় করতে জনসনকে ট্রাম্পের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা এতটাই সামান্য ছিল যে, কখনো কখনো মাত্র একজন বা দুজন সদস্যের আপত্তিতে দলের কর্মসূচি আটকে গেছে। তাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। আবার কয়েকজন রিপাবলিকান সব ডেমোক্র্যাট সদস্যের সঙ্গে একজোট হয়ে দলের নেতাদের উপেক্ষা করা কোনো বিল আলোচনার জন্য উত্থাপনের উদ্যোগও নিয়েছেন।

বর্তমানে ১১৯তম কংগ্রেসে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের সদস্যসংখ্যা ২১৮, ডেমোক্র্যাটদের ২১৪, স্বতন্ত্র একজন এবং দুটি আসন শূন্য। গত দুই বছরে এই হিসাব বদলেছে। ট্রাম্প প্রশাসনে যোগ দিতে কয়েকজন সদস্য পদত্যাগ করেছেন। এ ছাড়া কয়েকজনের মৃত্যু, আগাম অবসর এবং অসদাচরণের অভিযোগে পদত্যাগের ঘটনাও ঘটেছে।

এপস্টিন-সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশ, ইরান বিষয়ে ট্রাম্পের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে অভিশংসনের প্রস্তাবের মতো রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর বিষয়ে দলের ভেতর থেকে বিরোধিতা দেখা গেছে। এসব ঘটনার পাশাপাশি জনসন সদস্যদের অধিবেশন বিরতিতে পাঠিয়েছেন নির্ধারিত সময়ের কয়েক দিন, কখনো কয়েক সপ্তাহ আগেই।

জেফরিসকেও একই ধরনের পরিস্থিতির মুখে পড়তে হতে পারে। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে কয়েকজন গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী রয়েছেন, যাদের কেউ কেউ দলীয় প্রাথমিক নির্বাচনে দীর্ঘদিনের দায়িত্বে থাকা নেতাদের হারিয়ে মনোনয়ন পেয়েছেন। এ ছাড়া এমন কিছু ডেমোক্র্যাট সদস্য রয়েছেন, যাদের নির্বাচনী এলাকায় ২০২৪ সালে ট্রাম্প জয় পেয়েছিলেন।

দলের সদস্যদের ঐক্যবদ্ধ রাখার ক্ষেত্রে সেপ্টেম্বরে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিলেন জেফরিস। ওয়াশিংটনের প্রতিনিধি মেরি গ্লুসেনক্যাম্প পেরেজ ও অবসরে যেতে যাওয়া মেইনের প্রতিনিধি জ্যারেড গোল্ডেন নিজ দলের অবস্থান থেকে সরে এসে রিপাবলিকানদের একটি দলীয় প্রক্রিয়াগত ভোটে সহায়তা করেন। ওই ভোটে রিপাবলিকানরা সমর্থন আদায়ে হিমশিম খাচ্ছিলেন।

নিজেদের অবস্থানের পক্ষে যুক্তি দিয়ে পেরেজ ও গোল্ডেন বলেছিলেন, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং মেইনের গলদা চিংড়ি আহরণকারীদের সুরক্ষার বিষয় দুটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, সেগুলোর অনুমোদন পিছিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না।

গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী গোষ্ঠীর কয়েকজন সদস্য এখনো প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার হিসেবে জেফরিসকে সমর্থনের বিষয়ে নিশ্চিত করেননি।

জানুয়ারিতে কলোরাডোর প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাওয়া মেলাত কিরোস সিবিএস নিউজকে বলেছেন, জেফরিসের সঙ্গে তার ‘চমৎকার আলোচনা’ হয়েছে। তবে স্পিকার হিসেবে তাকে সমর্থন করবেন কি না, এমন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি তিনি।

কিরোস বলেন, ‘আমি তাকেই সমর্থন করব, যিনি নিশ্চিত করবেন যে কর্মসূচি মার্কিন জনগণের অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।’

পেনসিলভানিয়ার নবনির্বাচিত প্রতিনিধি ক্রিস রাবও জেফরিসকে সমর্থন করবেন কি না, তা স্পষ্ট করেননি।

তিনি সিবিএস নিউজকে বলেন, ‘কে প্রার্থী হচ্ছেন, তা আমি জানি না। যারা আমার ভোট পেতে চান, তাদের সবার সঙ্গে বসতে আমি রাজি। তবে সেই বৈঠক না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে আলোচনা নিছকই অনুমান।’

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ