পাঠ্যবই নিয়ে বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না। ঢাকঢোল পিটিয়ে পরিমার্জনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ে ৮২টি ‘নৌকা’র ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।
পাঠ্যবই নিয়ে বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না। ঢাকঢোল পিটিয়ে পরিমার্জনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ে ৮২টি ‘নৌকা’র ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।
পাঠ্যবইগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০২৭ সালের জন্য মুদ্রিত প্রথম শ্রেণির ‘আমার বাংলা বই’-এ ৩৪, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ২৩, তৃতীয় শ্রেণিতে ২৫টি নৌকার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট তুলে ধরতে নৌকার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও এসব বইয়ে যে হারে এবং যেভাবে নৌকার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে, তার বেশির ভাগই অপ্রাসঙ্গিক। তবে চতুর্থ শ্রেণির বাংলা বইতে দুটি ও পঞ্চম শ্রেণির বইতে পাঁচটি নৌকার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে, যা প্রাসঙ্গিক।
একই চিত্র দেখা গেছে তৃতীয় শ্রেণির ‘আমার বাংলা বই’-এ। বইটির প্রচ্ছদের ভেতরের পাতায় নদী ও একাধিক নৌকার দৃশ্য দিয়ে শুরুতেই অতিরঞ্জন করা হয়েছে। পরে ৩৭ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘বালুচরে একদিন’ আলোচনায়, ৩৮ নম্বর পৃষ্ঠায়, ৪২ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘আমাদের গ্রাম’ কবিতায়, ৪৫ ও ৪৬ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘নদীর দেশ’ অধ্যায়ে, ৬৫ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘আজিকার শিশু’ কবিতায় এবং ৮৩ নম্বর পৃষ্ঠায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘তালগাছ’ কবিতার মতো জায়গায়ও নৌকার ছবি জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া মাধ্যমিকের ষষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বইয়ে দাঁড়িপাল্লার ব্যবহার নিয়েও বিতর্ক চলছে। এনসিটিবি জানায়, ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বইয়ের সংখ্যা ৩৮ লাখ। এর মধ্যে ১৮ লাখ স্কুল পর্যায়ে সরবরাহ করা হয়েছে। আর ২০ লাখ বইয়ের ছাপার কাজ চলছে। উপজেলা পর্যায়ে পাঠানো বই ঢাকায় ফেরত আনা হবে। এরপর সব বইয়ের ওই পৃষ্ঠা ফেলে নতুন করে সংশোধিত পৃষ্ঠা লাগানো হবে।
আইসিটি বইটির প্রথম অধ্যায়ের ‘উপাত্ত ও তথ্য’ আলোচনায় থাকা ‘নলেজ পিরামিড’ বা জ্ঞানের পিরামিড মডেলটি বিশ্লেষণ করে জানা যায়, সেখানে উপাত্ত, তথ্য, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা—এই চারটি স্তরের প্রতীকী চিত্র রয়েছে। এর মধ্যে ‘প্রজ্ঞা’ বোঝাতে দাঁড়িপাল্লা ব্যবহার করা হয়েছে। তবে বিগত তিন শিক্ষাবর্ষের বই তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে এক অদ্ভুত পরিবর্তনের চিত্র মেলে। ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের বইয়ে ‘উইজডম বা প্রজ্ঞা’ বোঝাতে দাঁড়িপাল্লা রাখা হয়েছিল। পরে ২০২৬ সালের বইয়ে সেটি পরিবর্তন করে ‘উইজডম’-এর বাংলা করা হয় ‘বুদ্ধি’ এবং প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয় মানুষের ‘মস্তিষ্ক’ বা ব্রেইন। ২০২৭ সালের জন্য মুদ্রিত বইয়ে আবারও ‘উইজডম’-এর বাংলা ‘প্রজ্ঞা’ এবং প্রতীক হিসেবে ‘দাঁড়িপাল্লা’ ব্যবহার করা হয়।
সূত্র জানায়, ২০২৭ শিক্ষবর্ষের বইয়ের পরিমার্জন সংক্রান্ত প্রধান সমন্বয়কারী ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের চারজন শিক্ষক। তাঁরা হলেন—অধ্যাপক মো. আলী জিন্নাহ, অধ্যাপক শাহ শামীম, অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান এবং অধ্যাপক নূরে আলম সিদ্দিকী। তাঁরা বইটি ফাইনাল করার পর তা গেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটিতে (এনসিসি)। এনসিসি কর্তৃক চূড়ান্ত অনুমোদনের পর তা প্রিন্টের জন্য প্রস্তুত করা হয়।
পাঠ্যবই পরিমার্জনসংক্রান্ত প্রধান সমন্বয়কারী টিমের সদস্য অধ্যাপক মো. আলী জিন্নাহর কাছে জানতে চাইলে কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘পাঠ্যবইয়ের ব্যাপারে কোনো কিছু জানতে চাইলে এনসিটিবির চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলেন।’ কিন্তু এনসিটিবির চেয়ারম্যানকে গত রাতে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি সাড়া দেননি।
এনসিটিবির সদস্য (প্রাথমিক শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল হায়দার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রাথমিকের এসব বই গত কয়েক বছর ধরেই চলছে। এ বছর বই পরিমার্জনে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বিশেষজ্ঞরা ছিলেন। তাঁরা দেখে যেগুলো পরিবর্তন করতে বলেছেন সেগুলোই করা হয়েছে। একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, এনসিটিবি কিন্তু বই লেখে না। এ জন্য বিভিন্ন বড় বড় কমিটি রয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘এবার যে ছবিগুলো রাখা হয়েছে, সেগুলো কনটেন্টের সঙ্গে জড়িত। নদীমাতৃক দেশ বা আবহমান বাংলার ছবিতে নৌকা চলে আসে। এগুলো শিল্পীর আঁকা ছবি। বিখ্যাত শিল্পীরা কনটেন্টের সঙ্গে মিলিয়ে এঁকেছেন। কনটেন্ট পরিবর্তন না হলে ছবি কিভাবে পরিবর্তন হবে? তবে ২০২৮ শিক্ষাবর্ষে বইতে বড় পরিবর্তন আনা হবে। ফলে আগামী বছর অনেক কিছুই পরিবর্তন আসবে। তখন নিশ্চয়ই এই বিষয়গুলো ভাবা হবে।’