রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪২ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
ডিএমপির অভিযানে গ্রেপ্তার আরো ৫০৬ দেশে ভারী বর্ষণ নিয়ে নতুন পূর্বাভাস দিলো আবহাওয়া অধিদপ্তর বিয়ে হয়নি ইবিতে আটক হওয়া সেই প্রেমিক যুগলের হাদি হত্যা মামলার অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের শুনানি আজ জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ছেলে ও মেয়ে শিশুর পার্থক্যে চমকে উঠলেন বিজ্ঞানীরা! অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই পোশাক খাতে বড় ধাক্কা পর্যটনে বাড়ছে ডিজিটাল রূপান্তর ও এআই ব্যবহার পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে নির্বাচন চাইলেন মমতা, সিইসির গ্রেপ্তার দাবি জাসদ কার্যালয় থেকে আটক ২৮০-৩০০ জনকে যাচাই করা হচ্ছে: ডিসি হারুন বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলেই দেশেও কমবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই পোশাক খাতে বড় ধাক্কা

স্বদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ০ বার

বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ নানা সংকটে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। একে একে বন্ধ হয়েছে অসংখ্য পোশাক কারখানা।

খাতসংশ্লিষ্ট দুটি শীর্ষ সংগঠন—বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) ও বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৩-এর জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত দেশে মোট ৫৩৪টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এতে কর্মসংস্থান হারিয়েছেন ২ লাখ ৭৯ হাজার ২৫২ শ্রমিক। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে ২০২৫ সালে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলে। ওই এক বছরেই দেশে ২৬৪টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। এতে শুধু ওই এক বছরেই কাজ হারান ১ লাখ ৩৮ হাজার ২৪৪ জন শ্রমিক।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে তৈরি পোশাক খাত নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নানা প্রতিকূলতায় বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও কারখানা বন্ধ হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কারখানা বন্ধ হয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে, যার পেছনে অন্যতম বড় কারণ ছিল ওই সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, দেশজুড়ে অস্থিরতা ও কারখানাগুলোয় সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে রাজনৈতিক সরকার এলে অনেকটা স্থিতিশীলতা ফেরে। তবে আগের সংকটগুলোর প্রভাব, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকা, এর প্রভাবে দেশে জ্বলানি ও বিদ্যুৎ সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বিশ্ববাজারে চাহিদার সংকোচনসহ নানা কারণে ২০২৬ সালেও দেশে অনেক কারখানা বন্ধ হয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মোক্তাদিরও জানিয়েছেন, ২০২৩-এর জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত তিন বছরে চার শতাধিক গার্মেন্টস বন্ধ হয়েছে।

বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ থেকে প্রাপ্ত হালনাগাদ তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০২৩ সালে তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ হয় ১০০টি। এতে কর্মসংস্থান হারায় ৫১ হাজার ৩৪৭ জন শ্রমিক। অন্যদিকে ওই বছর দেশে নতুন কারখানা চালু হয় ১৭১টি। এসব কারখানায় কর্মসংস্থান হয় ৬৬ হাজার ৩৯৯ জন শ্রমিকের। এরপর ২০২৪ সালেও বন্ধ হয় মোট ১০০টি কারখানা। কর্মসংস্থান হারায় ৫৫ হাজার ৩৭৭ শ্রমিক। তবে ওই বছর ২০২৩ সালের চেয়ে কম সংখ্যক নতুন কারখানা চালু হয়। ২০২৪ সালে নতুন চালু হওয়া ১৩১টি কারখানায় ৬৪ হাজার ৫১৬ জনের কর্মসংস্থান হয়। এরপর সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগে ২০২৫ সালে। ওই এক বছরেই দেশে বন্ধ হয়ে যায় ২৬৪টি পোশাক কারখানা। বিপরীতে নতুন কারখানা চালু হয় ১৫০টি। বন্ধ কারখানাগুলোর হিসাবেই ওই বছর কাজ হারায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ২৪৪ জন শ্রমিক। অন্যদিকে নতুন চালু হওয়া কারখানাগুলোয় কর্মসংস্থান হয় ৭৬ হাজার ৪৭৯ জনের।

বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের মতে, কোনো একক কারণে কারখানাগুলো বন্ধ হয়নি। বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অনেক কারণে এটা হয়েছে। আগেও কারখানা বন্ধ হয়েছে, আবার নতুন কারখানা খুলেছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আগের সংকটগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতা, কারখানাগুলোয় বিশৃঙ্খলা, পাশাপাশি রাজনৈতিক কারণেও অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। সেখান থেকে বর্তমানে স্থিতিশীলতা ফিরলেও বৈশ্বিক কারণগুলো এবং জ্বালানি-বিদ্যুৎ সংকট ভুগিয়েছে। এর বাইরেও কারখানাগুলোর নিজস্ব অদক্ষতাও রয়েছে। সব মিলিয়ে ২০২৩ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত তিন বছরে আমাদের (বিজিএমইএর সদস্য) ২৫৬টি এবং চলতি বছরের আট মাসে ৩১টি বন্ধ হয়েছে।

তিনি মনে করেন, বন্ধ কারখানা ও কর্মসংস্থানের ঘাটতি পূরণে আরও বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হবে। পাশাপাশি ব্যবসার পরিবেশ, নীতির স্থিতিশীলতা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-জ্বালানি নিশ্চিতের তাগিদ দেন তিনি।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-এর জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত সময়ে বিজিএমইএর মোট ২৮৭টি সদস্য কারখানা বন্ধ হয়েছে। বিপরীতে নতুন চালু হয়েছে ৩৭১টি। এর মধ্যে ২০২৫ সালে বিজিএমইএর ১৬৮টি কারখানা বন্ধ হয়। ওই বছর নতুন চালু হয় ৮২টি কারখানা। অন্যদিকে ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত বিকেএমইএর মোট ২৪৭টি নিট পোশাক কারখানা বন্ধের বিপরীতে চালু হয় ১৮৭টি। অর্থাৎ বন্ধ কারখানার পাল্লাই ভারী। এ খাতেও ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি, মোট ৯৬টি সদস্য কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। বিপরীতে নতুন চালু হয় ৬৮টি কারখানা।

বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, নানা সংকটে গত কয়েক বছরে অসংখ্য কারখানা বন্ধ হয়েছে, বিনিয়োগ কমেছে। সচল অনেক কারখানাও লোকসানে চলছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালে কারখানাগুলোয় একের পর এক বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতা দেখা দেয়। সমস্যা নিয়ে যে তৎকালীন সরকারপ্রধানের সঙ্গে কথা বলব, সে সুযোগও পাইনি। ফলে পরিস্থিতি খারাপের দিকে যায়। ওই বছর সবচেয়ে বেশি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এখন দেশে রাজনৈতিক সরকার আসায় পরিস্থিতি বদলেছে। নতুন করে কিছু কারখানা চালু হয়েছে, কিন্তু কিছু সংকট থেকে যাওয়ায় ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি চাপে রয়েছে। তাদের টিকিয়ে রাখতে এ খাতে একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রয়োজন।

প্রকৃত চিত্র পরিসংখ্যানের চেয়েও নাজুক: খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারখানা বন্ধ হওয়া ও কর্মসংস্থান হারানোর প্রকৃত তথ্য পরিসংখ্যানের চেয়েও নাজুক। তাদের মতে, কারখানা বন্ধ হওয়া ও কর্মসংস্থান হারানোর প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।

বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, কাগজে যদি ৫০টি নতুন কারখানা নিবন্ধিত হয়, সেখানে প্রকৃত নতুন কারখানা ১০ থেকে ১৫টি হতে পারে। বাকিগুলো ব্যাংকিং জটিলতা বা অন্য কোনো কারণে পুরোনো ব্যবসা বন্ধ হওয়ার পর বিদ্যমান যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে নতুন নামে চালু করা প্রতিষ্ঠান হতে পারে। তাই নতুন সদস্য সংখ্যা বাড়লেও তা সরাসরি নতুন বিনিয়োগ বা নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চাপ: সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারখানা বন্ধ হওয়ার পেছনে প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ও তারল্যসংকট, চড়া সুদের হার, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতা, বিশৃঙ্খলা-মবের প্রভাব, জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট বৈশ্বিক যুদ্ধের প্রভাব ও চাহিদার সংকোচন উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি ঘনঘন নীতির পরিবর্তন, কর-ভ্যাট জটিলতা, অতিরিক্ত উৎপাদন ব্যয় ও শ্রমিক অসন্তোষ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এসবের বাইরে কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে নিজস্ব অদক্ষতা ও আয়ের চেয়ে ঋণ বেড়ে যাওয়ার কারণে।

প্রতিকূলতায় টিকতে না পেরে ২০ বছরের পথচলা শেষে গত ২৭ আগস্ট বন্ধ হয়ে যায় মিরপুর-১-এর ‘ম্যাট্রিক্স ড্রেসেস লিমিটেড’। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুবুল হাসান ফয়সাল বলেন, অনেকভাবে চেষ্টা করেছি। কিন্তু ক্রমাগত সংকট, অর্ডার ও দাম কমে যাওয়া এবং ব্যাংক ও নীতিনির্ধারণী সুবিধা না পাওয়ায় শেষমেশ কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছি।

বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান জানান, বৈশ্বিক সংকট এবং ব্যাংকগুলোর সক্ষমতার ঘাটতির কারণে কারখানাগুলো প্রয়োজনীয় সহায়তা পায়নি। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আশুলিয়া ও গাজীপুরে দীর্ঘ প্রায় এক মাস উৎপাদন বন্ধ থাকায় অনেক কারখানা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। তিনি আরও বলেন, নতুন কারখানা যুক্ত হলেও সেগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার ক্ষতি কতটা পূরণ করছে, তা স্পষ্ট বলা যাচ্ছে না। নতুনের সংখ্যা দিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক মনে হলেও প্রকৃত বিনিয়োগ, উৎপাদন সক্ষমতা ও কর্মসংস্থানে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা পূরণ করতে না পারলে আগামীতে আরও চাপ তৈরি হতে পারে।

সামনে আরও কারখানা বন্ধের ঝুঁকি: বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কারখানাগুলো হঠাৎ করে বন্ধ হচ্ছে না। বৈশ্বিক বাজারে অনিশ্চয়তার পাশাপাশি বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতাও তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে। আমদানি করা কাঁচামালের উচ্চমূল্য, জাহাজভাড়া ও ইন্স্যুরেন্স ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পোশাক উৎপাদনের সামগ্রিক খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর সঙ্গে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট যুক্ত হওয়ায় কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। নতুন শিল্পকারখানায় গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকার পাশাপাশি পুরোনো সচল কারখানাগুলোও নিয়মিত পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছে না। বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণেও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব রপ্তানির পরিসংখ্যানেও দেখা যাচ্ছে, যা খুব একটা ভালো অবস্থানে নেই।

তিনি আরও বলেন, এসব কারণে পোশাক কারখানাগুলোর ওপর পরিচালনাগত ও আর্থিক চাপ বাড়ছে, কারখানা বন্ধ হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারলে আগামীতেও বন্ধের ঝুঁকি রয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দ্রুত জ্বালানি সংকটের সমাধান এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার করা জরুরি। বৈশ্বিক কারণগুলো সরকারের হাতে নেই, অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো তো সরকারের হাতে রয়েছে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ব্যবসা পরিচালনার বিভিন্ন প্রক্রিয়া সহজ করতে বিজনেস সিঙ্গেল উইন্ডো চালু, লজিস্টিক পলিসি বাস্তবায়ন এবং পণ্য পরিবহনে টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম কমানোর মতো বিষয়গুলোয় নজর দিতে হবে।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ