বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ০৫:৫৭ অপরাহ্ন

টায়ারের পণ্য

ওমর শাহেদ: টায়ার থেকে পরিবেশ উপযোগী পণ্য তৈরি করেন সেখ সাদমান। তিনি জানান, এমন কোনো কাজ করব যেটির মাধ্যমে নতুন কোনো স্বপ্ন বা সমাজের নতুন কোনো সমস্যার সমাধান হবে। অন্যরাও সেখানে কাজ করতে পারবেন, নয়তো নতুন তেমন কোনো ক্ষেত্র বেছে নিতে পারবেন। ফলে গাড়ির টায়ার নিয়ে অনেক ভেবে কাজে নামলাম।
টায়ার সব উপায়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে পরিবেশের। পোড়ানো হলে গ্রিন হাউজ গ্যাসে প্রভাব ফেলে। ডেঙ্গু মশা উৎপাদনেরও অন্যতম জায়গা ফেলে রাখা, বাতিল টায়ার। বিশ্বের সব জায়গাতেই মশা জন্মানোর আদর্শ স্থান। তাতে পানি জমে, নোংরা হয়। মশা জন্মে, বাড়ে। বারবার ব্যবহার করা হয় টায়ারকে। ফলে সড়ক দুর্ঘটনাও বাড়ে। এই পদার্থ প্লাস্টিক, পলিথিনের মতো মাটিতে মিশে পচে না। পরিবেশের সঙ্গে কোনোভাবেও খাপ খায় না। পুড়লেও ক্ষতি। তাই তাকে নিয়ে ভাবনা। পুরনো টায়ারকে ব্যবহার উপযোগী করতেই কাজ করব, সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলো। তবে আমিই প্রথম ও একমাত্র মানুষ নই।
নানা দেশে রিসাইকেল বা আবার ব্যবহারোপযোগী করে টায়ারের নানা পণ্য তৈরি হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেনের পার্কগুলোতে যেসব দোলনা আছে, সেগুলোর বেশিরভাগই টায়ার দিয়ে বানানো। সেখানে দেখেছি। আবার বিভিন্ন দেশের সড়কের সাইন স্ট্যান্ড বা নির্দেশকের নিচে টায়ারের তৈরি পাত থাকে। ফলে সেগুলো আরও উঁচু এবং ওজনদার হয়। তবে আমাদের দেশে অনেক খুঁজে আশপাশে আর কোনো তরুণ বা অন্যরকম এমন কোনো উদ্যোক্তার দেখা পাইনি। সেই থেকে আশায় আছি কেউ যদি টায়ার দিয়ে কোনো কিছু করতে চান, বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে চান; তাকে একেবারে ফ্রিতে হলেও সাহায্য করব। তাতে পরিবেশের অন্যতম শত্রু এবং সভ্যতার অন্যতম চালিকাশক্তি টায়ারের নব ব্যবহার হবে, এ নিয়ে মানুষের সচেতনতা বাড়বে।
প্রথমেই দেখলাম কী কী হতে পারে টায়ার নিয়ে। ভাবনাটির শুরু হয়েছিল মাকে দিয়ে। অনেকদিন ধরেই মা আমাদের বাসায় একটি নতুন সেন্টার টেবিল কেনার কথা বলছিলেন। ভাবলাম, টায়ার দিয়েই তাকে বানিয়ে দেব।
পড়ালেখা করে জানা হলো, আফ্রিকার একেবারেই অনুন্নত দেশে টায়ার থেকে স্যান্ডেল তৈরি হয় আর সেগুলো প্রথম বিশ্বের দেশগুলোতে বাহারি স্যান্ডেল হিসেবে খুব বিক্রি হয়। তাদের প্রধান বিদেশী আয়ই হয়ে গেছে টায়ারের স্যান্ডেল। তবে নতুন টায়ারের মধ্যে একটি কোডিং থাকে। সেটি মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর। ছয় মাসের ব্যবহারে পুরনো হয়ে গেলে আর কোনো ক্ষতি হয় না।
২০১৫ সালে কাজের হলো শুরু। পুরনো ঢাকার বিখ্যাত মার্কেট ধোলাইখালে গিয়ে দুটি পুরনো টায়ার ছয়শ টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে এলাম মগবাজারের বাসায়। নিজের হাতে সেগুলো পরিষ্কার করলাম। কালো, বাজে পদার্থ বেরুল। মা দেখেই নাক সিঁটকালেন, এগুলো কোনোভাবেই বাসায় রাখব না। ফেলে দিয়ে আয়। বললাম, দুই-তিনটি দিন কাজ করতে দিন। পরে ফেলে দেবেন না হয়। এরপর সেগুলো ফুটো করে সেখানে শিল্প প্রতিষ্ঠানের আঠা দিয়ে শক্ত করে জোড়া দিলাম একটি অন্যটির নিচে। অনেক ভেবে পাটের দড়ি কিনে নিয়ে এলাম ১৫ কেজিরও বেশি। সাড়ে ১৬শ টাকার সেই দড়িগুলো টায়ারের ওপর শক্ত করে বাঁধলাম একের ওপর এক। টেকসই, অনেক খুঁজে কেনা দড়িগুলো শক্ত করে বাঁধতেই আমার মতো লোকের দুটি দিন পেরিয়ে গেল। স্প্রে পেইন্ট করলাম। তার ওপর বাজার থেকে সাড়ে ১৪শ টাকায় ১০ মিলিমিটারের পুরু কাচ মাপমতো কিনে নিয়ে এসে বসালাম।
সেই থেকে দুই বছরেরও বেশি এই সেন্টার টেবিল বাসায় আছে। জোরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে না দিলে কোনোকিছুই হবে না। অন্যসব সেন্টার টেবিলের মতো যেকোনো কিছু তার ওপর রাখা যাচ্ছে। মাও খুব খুশি। এমন কোনো সেন্টার টেবিল বাজারে আছে কি না কিনে আনতে বললেন। অনেক খুঁজেও এরচেয়ে ভালো কিছু পাইনি। আমাদের বসার ঘরে ভালোভাবেই আছে টেবিলটি। পাটের দড়ির সঙ্গে থাকতে থাকতে এখন তার আগের চেয়ে পরিবেশের দূষণের মাত্রা অনেক কমেছে নিশ্চয়ই। এই সাফল্যের পর এর পেছনেই আছি।
আমি এমন একজন মানুষ যে হাতের কাছে কিছু পেলেই উৎপাদনে লেগে পড়ে। সেভাবেই টায়ারে আছি। তবে তাতে বাড়ির লোকেরা খুব অখুশি। ভালো পরিবারের ছেলে আমি। নানার নিজের কেমিক্যালের কারখানা ছিল। তিনি প্যারিস থেকে পাস। অনেক বড় প্রতিষ্ঠানে ছিলেন। নানাবাড়িতে সবাই মিলে থাকি। তারাও ভালোভাবে নেন না। আশপাশের লোকেরা মনে করে দামড়া ছেলে ঘুরেফিরে খায়, কোনো কাজ করে না কেন? বাবা কোনো একভাবে একটি চাকরি জোগাড় করেছেন দিন কয়েক আগে, সেটি না নিয়ে আমি পত্রিকা অফিসে বসে সাক্ষাৎকার দিচ্ছি।
আমার যে চাকরি করার কোনো ইচ্ছেই নেই। আট থেকে ১০ বছর তো তরুণদের নিয়ে কাজ করছি। এখন হয়েছি উদ্যোক্তা। ২০১৬ সালে সেই সেন্টার টেবিল বানানোর পর বানালাম আমাদের বারান্দায় একটি দোলনা। সেও এক গল্প। আমাদের বাড়িতে অনেকগুলো ছোট ছোট ছেলেমেয়ে আছে। সবাই খালা, মামা, ভাইবোন। ওরা আবদার করল তাদের জন্য একটি দোলনা কিনে দিতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে সাড়ে তিনশ টাকা দিয়ে ভালো মানের একটি টায়ার কিনে নিয়ে এলাম। সেটিকে ভালোভাবে পরিষ্কার করে, ভালো শক্ত নাইলনের দড়ি কিনে এনে রং করে ওপরে হুক দিয়ে দোলনা বানিয়ে দিয়েছি। ওরা সেটির ওপর লাফায়ও। আরও অনেককে বিনা খরচে এই দোলনা বানিয়ে দিয়েছি। তারা খুব খুশি। এভাবে নানা ধরনের টায়ারের পণ্য বানিয়েছি নিজে বাড়িতে বসে। ফলে এখন আর আমাকে দেখে খারাপ টায়ার দিতে কোনোভাবেই সাহস পান না টায়ারের দোকানদাররা। দেখেই বুঝে ফেলি, কোনটি ভালো আর কোনটি খারাপ। টায়ার কেটে বুকসেলফও বানিয়েছি। আছে আমাদের বাসার দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে। চারপাশে তার সবুজ রং। আছে আমাদের সিটিং টুল। প্লাস্টিকের টুলের বিকল্প, ভেতরে জালি আছে বলে কেউ নিচে পড়ে যান না। তবে দারুণভাবে হিট করেছে ট্রাম্পোলাইন। এটি সার্ক চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের প্রদর্শনীতে দেখিয়েছি। আড়াইশ জনেরও বেশি মানুষ খেলনাটির ওপর লাফিয়েছেন। কোনো ক্ষতি হয়নি। বরং তারা অন্যগুলোর মতোই মজা পেয়েছেন। একেবারেই দারুণ, কোনোভাবেই পা আটকে যাবে না। শেষমেষ বানাতে সাড়ে তিন হাজারের মতো দাম পড়েছে আমার। তবে নানা নমুনা বানিয়ে যখন বাজারে ছাড়ব তখন সাড়ে পাঁচ হাজারের মতো দাম পড়বে। আসলে আমার তো ৭০ হাজার টাকা খরচ পড়েছে এর পেছনে, ভালো করে বানানোর জন্য। জিম বা ব্যায়ামাগারগুলোতে এমন ট্রাম্পোলাইন আছে দেশে, বিদেশে। ওজন কমানোর জন্য, ফিট থাকতে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ ব্যবহার করেন। সেই বড় ট্রাম্পোলাইনের ওপর একসঙ্গে ২০ থেকে ৫০ জন মানুষও লাফাতে পারেন। আমাদের দেশেও আছে, ওয়ান্ডারল্যান্ডেই তো আছে। যে ট্রাম্পোলাইন বানাচ্ছি, সেটি সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা ব্যবহার করবে। তারা যেসব স্কুলে পড়ে, সেখানে তারা খেলতে পারে না। নোংরাতে থাকে, ভালো পার্কেও পয়সার অভাবে যেতে পারে না। তাদের জন্য টিফিনের সময় আনন্দদানের ব্যবস্থা করবে আমার এই খেলনা।
এই কাজের আগে ঢাকার ধানমন্ডির ২৭ নম্বরের ইএমকে (এডওয়ার্ড এম কেনেডি) সেন্টারে গিয়েছিলাম। তাদের সঙ্গে টায়ারের ১০টি নমুনা পণ্য বানানোর চুক্তি হলো। তারা টাকা দিলেন। এই বছরের জানুয়ারিতে কাজের শুরু হলো। ভাড়াটিয়া তুলে দিয়ে বাড়ির বিরাট নিচতলাকে আমার কারখানা বানিয়ে ফেললাম। শুরু হলো কাজ। আগের পণ্যগুলো আবার নতুন করে, ভালোভাবে ভেবে বানালাম। যোগও হলো কিছু। তারা আমার কাজ চুক্তি অনুসারে নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে দেখতে এলেন। পছন্দ করলেন, নিজেদের চাহিদা জানালেন, আমিও ভাবনা ভালো করে করার সুযোগ পেলাম। ফলে গত মাসে অনেক খাটুনির পর তৈরি হয়ে গেল সেগুলো। শুক্র ও শনিবার তাদের অফিসে প্রদর্শনী হলো। নাম ছিল ‘এনভায়রনমেন্ট ফ্রেন্ডলি প্রডাক্ট থ্রু টায়ার’। মানে টায়ার থেকে পরিবেশবান্ধব পণ্য। নানা বয়সের অনেক দর্শক ছিলেন, খুব উৎসাহ, ভালোবাসা পেয়েছি। সেখানে টিনা জেবিন ছিলেন। তিনি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের স্টার্টআপ (নতুন কোনো কিছু শুরু) উপদেষ্টা। খুব উৎসাহ দেখালেন, কাজ ভালোভাবে দেখলেন। ফলে আরও সাহস হয়েছে।
এখন লক্ষ্য, ২০২০ সাল থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাব। আমার অনেক পণ্য থাকবে। কেউ সাহায্য করলে ভালো, নয়তো নিজেই পরিবেশকে বাঁচাতে কাজে নামব। বিভিন্ন জায়গায় প্রদর্শনীর মাধ্যমে পণ্যগুলো বিক্রি করব। কোনো তরুণ কাজ করতে চাইলে তাকে বিনা খরচে সাহায্য করব। যাতে তিনিও পৃথিবীকে বাঁচাতে কাজে নামেন।
নানা দেশে এমন অনেক পণ্য আছে। ব্রিটেন, কানাডা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে টায়ার রিসাইক্লিং সেন্টারও আছে। সেখানে টায়ার থেকে নানা পণ্যও থাকে। বিদেশে এই কাজ করেন এমন অনেক বড় কোম্পানিও আছে। টায়ার দিয়ে বেল্টও হয়। আরও কত কিছু যে সম্ভব!

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

© All rights reserved © 2019 shawdeshnews.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
themebashawdesh4547877