শুক্রবার, ০১ মার্চ ২০২৪, ০২:২৫ অপরাহ্ন

নির্বাচনে ঝুলে গেছে নেতানিয়াহুর ভবিষ্যৎ……..???

নির্বাচনে ঝুলে গেছে নেতানিয়াহুর ভবিষ্যৎ……..???

আবু ইউসুফ: ইসরায়েলের এবারের নির্বাচনী ফলাফলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, দেশটির সবচেয়ে বেশি দিন প্রধানমন্ত্রী থাকা নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অনিশ্চিত রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে দ্বিতীয় নির্বাচনের পর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক সেনানায়ক বেনি গান্টজের সঙ্গে জোট সরকার গঠন নিয়ে লড়াই চলছে তার। গত এপ্রিল আর এবারের সাধারণ নির্বাচন উভয় দফা ভোটেই সুস্পষ্ট জয় পেতে ব্যর্থ হয়েছেন পোড় খাওয়া নেতানিয়াহু। সরকার গঠন নিয়ে শিগগিরই ফয়সালার লক্ষণ নেই। ১২০ সদস্যের পার্লামেন্ট নেসেটে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দল ৩২টি আসন পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছে। প্রথম স্থানে আছে সাবেক সেনাপ্রধান বেনি গান্টজের মধ্যপন্থি ‘ব্লু অ্যান্ড হোয়াইট’ জোট। দুজনের কেউই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন যেমন দেখাতে পারছেন না, তেমনি দুজনে মিলেও যে একটি ঐকমত্যের সরকার গড়বেন মিলছে না তার লক্ষণও। পরবর্তী সরকার গঠন নিয়ে তাই চরম অচলাবস্থা চলছে।
ইরান-সৌদি-মার্কিন সংকটের প্রেক্ষাপটে দ্রুত একটা মতৈক্যের সরকারের জন্য তাগিদ বাড়ছে ইসরায়েলে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সদা উত্তপ্ত রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা অন্যতম প্রভাবশালী দেশটিতে কে ক্ষমতায় আসছে তার চেয়ে এবারের নির্বাচনের ফল ঠিক কী বলছে তা কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। ভোট দেওয়াসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জনমত আর জনগোষ্ঠীগত পরিবর্তনের বিষয়ে কিছু স্পষ্ট ইঙ্গিতই মিলছে এ থেকে। তা কী রকম সে বিষয়টিই একটু খতিয়ে দেখা যাক।
নির্বাচনী প্রচারণার সময় ইসরায়েলিদের অনেকেই বলেছিল, তারা ভোট দিতে দিতে বিরক্ত। আসলেই এত স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ভোট দিয়ে অভ্যস্ত নয় তারা। এর আগে কখনোই এক বছরের মধ্যে দুই দফা ভোট দেয়নি দেশটির মানুষ। ভোটাররা ক্লান্ত এমন গুঞ্জন হাওয়া পেয়েছিল বেশ। শেষমেশ অবশ্য বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক (৭০ শতাশং) ইসরায়েলি ভোটারই কেন্দ্রে গেছেন ১৭ সেপ্টেম্বর। কৌতূহলকর ব্যাপার, এপ্রিলের নির্বাচনের চেয়েও তা বেশি। তখন ভোট পড়েছিল ৬৮.৫ শতাংশ। এবার ভোটের হার বাড়ার অন্যতম কারণ, ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকরা (জাতিগত আরব ইসরায়েলি) বেশি হারে ভোট দিয়েছে। আর যে সংখ্যালঘু গোষ্ঠী আগের মতোই ব্যাপক হারে ভোট দিয়েছে, তারা হচ্ছে অতি কট্টর ইহুদি সম্প্রদায়। আরব ইসরায়েলি আর কট্টর ইহুদিÑ দুই গোষ্ঠীই নির্বাচনী প্রচারণার সময় নিন্দার মুখে পড়েছে। আরব ইসরায়েলি দলগুলো নেতানিয়াহুর কাছ থেকে। অন্যদিকে অতি কট্টর ইহুদিদের ধোলাই করেছেন সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী আভিগদর লিবারম্যান। নেতানিয়াহুর অভিযোগ ছিল, আরব ইসরায়েলিরা নির্বাচনের ফল ছিনতাইয়ের চেষ্টা করছে। অন্যদিকে লিবারম্যানের অভিযোগ, ইসরায়েল ধর্মতাত্ত্বিক রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এ ধরনের প্রচারণার ফলাফল : দুই পক্ষই মহা জোশ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে ভোটের ময়দানে।
ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের গবেষক ইয়োহানান প্লেজনার বললেন, এই দুটি হচ্ছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ জনগোষ্ঠী। বিশেষ করে কট্টর ইহুদিদের ক্ষেত্রে বলতে হয়, তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা বেড়েছে, যার প্রতিফলন ঘটেছে জনতাত্ত্বিক প্রভাবেও। সংখ্যালঘু উগ্রপন্থিদের উত্থান ঘটলেও কট্টর ডানপন্থি হিসেবে পরিচিত নেতানিয়াহুর প্রতি জনসমর্থনের ভিত দুর্বল হয়েছে এবারের নির্বাচনে। ইসরায়েলের রাজনীতিতে ‘জাদুকর’ হিসেবে খ্যাত নেতানিয়াহু ১৯৯০-এর দশকে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হন। সেখান থেকে গত দশকেও তিনি বারবার ক্ষমতায় ফিরে এসেছেন সাফল্যের সঙ্গে। নেতানিয়াহুর সাফল্যের পেছনের রহস্য হলো তার ডানপন্থি লিকুদ পার্টির পাশে বিভিন্ন শ্রেণির ভোটারদের জড়ো করতে পারা। তাদের মধ্যে আছে আরও বেশি ডানপন্থি জাতীয়তাবাদী আর অতি কট্টর ইহুদি ভোটার। নেতানিয়াহুর জীবনী লেখক, সাংবাদিক আনশেল ফেফারের ভাষ্য, লিকুদ পার্টির এই নেতা ডানপন্থি কথিত ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ইসরায়েলিদের সঙ্গে ধর্মমুখী ভোটারদের মেলবন্ধন ঘটাতে শুরু করেন সেই ১৯৯০-এর দশকে। সেই জোটে এখন ভাঙনের সুর বাজছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, লিবারম্যান তার আটটি আসনের মধ্যে দুটি জিতেছেন লিকুদদের ভোট কেড়ে নিয়েই। নেতানিয়াহুর প্রতি আনুগত্যের চেয়ে ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয়কে আগে স্থান দিয়েছেন ওই ভোটাররা। সাংবাদিক আনশেল ফেফারের মতে, নেতানিয়াহু মন্ত্রের রেশ কেটে গেছে বলেই মনে হচ্ছে। তাকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে সরানো সহজ না হলেও সে দিনটি শেষ পর্যন্ত আসবেই। এড়ানো যাবে না। শুধু ডানপন্থি ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ আর ধার্মিক ভোটারই নয়, নেতানিয়াহুর সমর্থকদের আরও কিছু অংশও তাকে ছেড়ে যেতে শুরু করেছে। দুই দফা নির্বাচনের মাঝের কয়েক মাসে ইথিওপীয় ইসরায়েলিরা প্রতিবাদ-বিক্ষোভ শুরু করে। এক পুলিশ কর্মী গুলি করে ওই সম্প্রদায়ের একজনকে হত্যা করার পর ওই বিক্ষোভ শুরু হয়। ইথিওপীয় বংশোদ্ভূত ইসরায়েলিরা বহুদিন ধরেই তাদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের অভিযোগ করে আসছে। লক্ষণীয় আরেকটি বিষয় ফিলিস্তিনি ইস্যু। অধিকৃত পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম ও গাজায় বসবাসকারী প্রায় পঞ্চাশ লাখের মতো ফিলিস্তিনি ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোট দিতে পারে না। তবে তাই বলে ভোটারদের সিদ্ধান্ত তাদের ওপর প্রভাব ফেলতে ছাড়বে না। জরিপ পরিচালনাকারী ড. খলিল শিকাকির মতে, এবারের নির্বাচনী প্রচারাভিযান ফিলিস্তিনিদের মধ্যে এই ধারণাকেই আরও পোক্ত করেছে যে, ‘দুই রাষ্ট্র সমাধান’ নামে পরিচিত দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক ফর্মুলাটি আর কার্যকর নয়।
শিকাকি বলেন, ‘এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, ইসরায়েলে নির্বাচনী প্রচারণার সময়কার আলাপ-আলোচনা আর বিতর্ক কূটনীতি ও শান্তি আলোচনার পক্ষে ফিলিস্তিনিদের সমর্থনের বড় রকমের ক্ষতি করেছে।’ এ প্রসঙ্গে জর্ডান উপত্যকা এবং পশ্চিম তীরের সমস্ত ইসরায়েলি বসতি সংযুক্ত করে নেওয়ার ব্যাপারে নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করেন ড. শিকাকি। ১১ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর খলিল শিকাকির গবেষণা সংস্থা ‘ফিলিস্তিনি সেন্টার ফর পলিসি অ্যান্ড সার্ভে রিসার্চ’ পরিচালিত জরিপের ফল বলছে, এখন মাত্র ৪২ শতাংশ ফিলিস্তিনি ‘দুই রাষ্ট্র সমাধান’ সমর্থন করে। অথচ নেতানিয়াহু এক দশক আগে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পদার্পণের সময় এর হার ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ। একইভাবে, ইসরায়েলেরও অর্ধেকের কম মানুষ এখন ‘দুই রাষ্ট্র সমাধান’ সমর্থন করে। জরিপকারীরা বলেছেন, প্রয়োজনীয় ছাড় দিতে কিংবা কার্যকর একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবে এমন ফিলিস্তিনি সহযোগী পাওয়া যাবে কি না তা নিয়ে ইসরায়েলিরা সন্দিহান। ড. শিকাকি বলেছেন, ফিলিস্তিনিদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরং একটি ‘এক-রাষ্ট্র’ সমাধানেরই পক্ষে যাতে ভূমধ্যসাগর এবং জর্ডান নদীর মাঝখানে একটিমাত্র দেশ থাকবে। সেখানে প্রতিটি ব্যক্তির সমান ভোট থাকবে। তবে ইসরায়েলিরা এর মধ্যে হয়তো ইহুদি রাষ্ট্রের সমাপ্তির ঝুঁকিই দেখতে পাবে।
বামদের বেহাল অবস্থা এবারের নির্বাচনের আরেকটি চোখে পড়ার মতো বিষয়। প্রথাগত বামপন্থি দল খুব খারাপ করেছে। তবে বেশ কিছুদিন ধরেই তাদের অবস্থা খারাপ হচ্ছিল। ইসরায়েলি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন থেকে বিকশিত বামদল লেবার পার্টি অন্য দলের সঙ্গে জোট করেও মাত্র গোটা ছয়েক আসন জিতেছে। অথচ শিমন পেরেস ও আইজ্যাক র‌্যাবিনসহ ইসরায়েলকে চার চারজন প্রধানমন্ত্রী দিয়েছে এ দল। ১৯৯০-এর দশকেও ভোটাররা পার্লামেন্ট নেসেটের ৩৪ থেকে ৪৪ টি আসনে জয়ী করত তাদের। লেবার পার্টি ঐতিহাসিকভাবে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে আলোচনার আহ্বান জানানো প্রথম বড় দল। সেই পরিস্থিতির নাটকীয়রকম পরিবর্তন ঘটেছে। লেবারদের বহু ভোট অন্যদিকে চলে গেছে, প্রথমে গেছে আরও মধ্যপন্থি একটি দলে এবং এখন বেনি গান্টজের ‘ব্লু অ্যান্ড হোয়াইট’ জোট-এ। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ঘটেছে এই উলেখযোগ্য পালাবদলটি। ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের ইয়োহানান প্লেজনার বলেছেন, ‘ব্লু অ্যান্ড হোয়াইট’ জোটের ফিলিস্তিনি ইস্যুতে নিজেদের ব্যস্ত করার কোনো আগ্রহ ছিল না। প্লেজনারের মতে, তারা বুঝতে পেরেছে আপাতত শান্তির কোনো লক্ষণ নেই। আবার সুরক্ষা সীমানার বাইরে বসতি সম্প্রসারণেরও আগ্রহ নেই তাদের।’
প্লেজনার আরও বলেছেন, নেতাদের বিষয়ে কোনো তদন্তের বিষয় থাকলে ইসরায়েলি ভোটাররা আইনের শাসনের পক্ষেই থাকে। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে প্রতারণা, ঘুষগ্রহণ ও বিশ্বাস লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা তিনি অস্বীকার করেছেন। বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করে ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের এই গবেষক উল্লেখ করেন, জোট সরকার গঠনের একটি প্রয়াসের সময় বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে বিচার থেকে অব্যাহতি দিতে একটি প্যাকেজ নিয়ে আলোচনা হয়। অক্টোবরেই ওই অভিযোগগুলোর বিষয়ে শুনানির মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন নেতানিয়াহু। নির্বাচনের যে ফল হয়েছে তাতে স্বাভাবিকভাবেই দর-কষাকষির প্যাকেজটি অনেকটাই ঝুলে গেছে। মোটের ওপর ইয়োহানান প্লেজনারের মূল্যায়ন: নির্বাচনের ফলাফল ইসরায়েলিদের স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধিকেই তুলে ধরেছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশে^র অনেকেরই নজর এখন ইসরায়েলের সরকার গঠনের পরবর্তী ধাপের দিকে। বড় কোনো নীতিগত পরিবর্তন প্রত্যাশিত না হলেও শান্তিপ্রক্রিয়ার বিষয়ে নতুন সরকার কোন পথে হাঁটে, তা দেখতে আগ্রহী সবাই। তা হৃতবল কট্টর ডান নেতানিয়াহু কিংবা মধ্যপন্থি বেনি গান্টজ ক্ষমতা যার হাতেই যাক না কেন। সরকার গঠন নিয়ে চলমান দর-কষাকষির ধারাবাহিকতায় একটু আশার আলো দেখেছেন নেতানিয়াহু। গত বুুধবার রাতে প্রেসিডেন্টের দপ্তর থেকে তাকেই নতুন সরকার গঠনে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। নেতানিয়াহু শিগগিরই এতে সাফল্য পাবেন, সে আশা যদিও ক্ষীণ। এ কারণেই হয়তো প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে সরকার গঠনের আহ্বানকে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন তৃতীয় দফা নির্বাচনের পথেই আরেকটি পদক্ষেপ বলে। কিন্তু পোড় খাওয়া নেতানিয়াহু এত সহজে হাল ছাড়বেন এটা মনে করাও কঠিন।
(বিবিসি ও হারেৎজ পত্রিকা অবলম্বনে), ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক লেখক।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

© All rights reserved © 2019 shawdeshnews.Com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
themebashawdesh4547877