রাজধানী ঢাকায় খুনের ঘটনা যেন থামছেই না। এক মাসে কিছুটা কমলেও পরের মাসেই আবার বেড়ে যাচ্ছে। প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, ফাঁদে ফেলে হত্যা, খুনের পর লাশ টুকরো করে ফেলে দেওয়া, পারিবারিক বিরোধ কিংবা রাজনৈতিক সংঘাতে প্রাণহানির ঘটনা রাজধানীবাসীর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি বাড়িয়ে তুলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তদন্তের ধীরগতি ও বিচারপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন- এ ছয় মাসে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ১২২টি হত্যা মামলা হয়েছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১২২ জন। অর্থাৎ, গড়ে প্রতি মাসে ২০ জনের বেশি মানুষ হত্যার শিকার হয়েছেন। এসব মামলায় ১৭৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও তদন্ত শেষ করে আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে মাত্র ৯ মামলায়।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু গ্রেপ্তারই যথেষ্ট নয়; দ্রুত তদন্ত ও বিচারের অগ্রগতি না থাকলে অপরাধীদের মধ্যে দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হয়, যা ভবিষ্যতে আরও সহিংস অপরাধকে উৎসাহিত করতে পারে।
ডিএমপির অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজধানীর হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে বড় কারণ পূর্বশত্রুতা। ছয় মাসে এ কারণে অন্তত ৩০ জন নিহত হয়েছেন। এরপর রয়েছে পারিবারিক কলহ, সম্পত্তি বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক সংঘাত, ছিনতাই, ধর্ষণের পর হত্যা, পরকীয়াজনিত বিরোধ, যৌতুক এবং অন্যান্য কারণ। মার্চ ও জুন মাসে হত্যাকাণ্ড সবচেয়ে বেশি হয়েছে। জুনে ২৫টি এবং মার্চে ২৪টি হত্যা মামলা হয়।
ছয় মাসে কয়েকটি হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা হত্যা। ধর্ষণের পর শিশুটিকে হত্যা করে মাথা বিচ্ছিন্ন করা হয়। ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই অভিযুক্ত সোহেল ও তার স্ত্রী স্বপ্নাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে আদালত তাদের মৃত্যুদণ্ড দেন।
মে মাসে মান্ডায় প্রবাসী মোকাররম মিয়ার লাশ আট টুকরো করে বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেওয়ার ঘটনাও চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। তদন্তে উঠে আসে, প্রেমের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করা হয়।
জুনে একের পর এক হত্যাকাণ্ড রাজধানীবাসীকে আরও উদ্বিগ্ন করে। কলাবাগানে ছোট ভাইয়ের ডাম্বেলের আঘাতে এসএসসি পরীক্ষার্থী বড় ভাই নিহত হন। তুরাগ নদীতে বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধারের ঘটনায় হানিট্র্যাপের মাধ্যমে অপহরণ ও হত্যার তথ্য পায় তদন্তকারী সংস্থা। গেন্ডারিয়া, কামরাঙ্গীরচর ও কদমতলীতেও পূর্বশত্রুতার জেরে পৃথক হত্যাকাণ্ড ঘটে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, রাজধানীর আলোচিত হত্যাকাণ্ডগুলোর দ্রুত রহস্য উদ্ঘাটন ও বিচার নিশ্চিত করা না গেলে অপরাধীদের মধ্যে আইনের ভয় কমে যেতে পারে।
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, ছয় মাসে হওয়া ১২২টি হত্যা মামলার মধ্যে চার্জশিট হয়েছে মাত্র ৯টিতে। জানুয়ারিতে তিনটি, ফেব্রুয়ারিতে একটি এবং মার্চে পাঁচটি মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে। এপ্রিল, মে ও জুনের কোনো মামলায় এখনও চার্জশিট দেওয়া হয়নি।
ডিএমপির মিডিয়া বিভাগের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি) নিয়াজ মেহেদী বলেন, প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে পুলিশ তৎপর রয়েছে। এক্ষেত্রে আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই। তিনি বলেন, খুনসহ সব ধরনের অপরাধ কমিয়ে আনতে পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। বেশিরভাগ ঘটনায় আসামিদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। প্রতিরোধমূলক পুলিশিংও চলছে। ফরেনসিক প্রতিবেদন, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের কারণে অনেক মামলার তদন্ত শেষ করতে সময় লাগছে বলে মত এ পুলিশ কর্মকর্তার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, অপরাধের ধরন আগের তুলনায় অনেক বেশি সংগঠিত ও পেশাদার হয়ে উঠেছে। তার ভাষায়, একসময় অভাব বা মাদকনির্ভর অপরাধ বেশি দেখা যেত। এখন পেশাদার অপরাধী গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। ফলে পুরনো কাঠামো দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তিনি আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, আধুনিক তদন্তব্যবস্থা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার গতি বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, রাজধানীতে হত্যাকাণ্ডের বড় অংশ পূর্বপরিকল্পিত বা পূর্বশত্রুতার জেরে ঘটছে। অনেক ঘটনায় অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হলেও তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া একই গতিতে এগোচ্ছে না। ফলে অপরাধ দমনে কাক্সিক্ষত বার্তা যাচ্ছে না। তাদের মতে, হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধে শুধু ঘটনার পর অভিযান নয়, বরং সংঘাতপ্রবণ ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে আগেভাগে শনাক্ত করা, গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো, স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ডিএমপির বিভিন্ন থানায় জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত রুজুকৃত খুন মামলার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, জানুয়ারি মাসে রাজধানীতে ২১টি খুনের ঘটনায় ২১টি মামলা রুজু করা হয়েছে। এসব মামলায় ৩৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ মাসে পূর্বশত্রুতার জেরে পাঁচজন, পারিবারিক কলহের কারণে তিনজন, অন্যান্য কারণে তিনজন, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের কারণে দুজন, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুজন ও রাজনৈতিক কারণে পাঁচজন খুন হয়েছেন। এ মাসে ২১টি মামলার মধ্যে তিনটি মামলার তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে।
ফেব্রুয়ারি মাসে ১৭টি খুনের ঘটনায় ১৭টি মামলা রুজু করা হয়েছে। এসব মামলায় ২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ মাসে পূর্বশত্রুতার জেরে চার, পারিবারিক কলহের কারণে তিন, অন্যান্য কারণে চার, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের কারণে দুই, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এক এবং রাজনৈতিক কারণে একজন খুন হয়েছেন। এ মাসে ১৭টি মামলার মধ্যে একটি মামলার তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে।
মার্চ মাসে ২৪টি খুনের ঘটনায় ২৪টি মামলা রুজু করা হয়েছে। এসব মামলায় ২৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ মাসে পূর্বশত্রুতার জেরে ছয়জন, পারিবারিক কলহের কারণে তিন, অন্যান্য কারণে পাঁচ, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই, ছিনতাইকারীর হাতে এক, যৌতুকের দাবিতে এক, কথা কাটাকাটির জেরে এক এবং ধর্ষণের পর একজন খুন হয়েছেন। এ মাসে ২৪টি মামলার মধ্যে পাঁচটি মামলায় আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে।
এপ্রিল মাসে ১৭টি খুনের ঘটনায় ১৭টি মামলা রুজু করা হয়েছে। এসব মামলায় ২৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ মাসে পূর্বশত্রুতার জেরে ছয়জন, পারিবারিক কলহের কারণে তিনজন, অন্যান্য কারণে চারজন, রাজনৈতিক কারণে দুজন ও দুজন শিশু খুনের শিকার হন।
মে মাসে ১৮টি খুনের ঘটনায় ১৮টি মামলা রুজু করা হয়েছে। এসব মামলায় ৩৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ মাসে পূর্বশত্রুতার জেরে দুজন, পারিবারিক কলহের কারণে পাঁচজন, অন্যান্য কারণে চারজন, পরকীয়ার কারণে একজন, ধর্ষণের পর খুন হন একজন এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে খুন হন একজন।
সর্বশেষ জুন মাসে ২৫টি খুনের ঘটনায় ২৫টি মামলা রুজু করা হয়েছে। এসব মামলায় ৩৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ মাসে পূর্বশত্রুতার জেরে সাতজন, পারিবারিক কলহের কারণে ছয়জন, অন্যান্য কারণে পাঁচজন, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের কারণে তিনজন, ছিনতাইকারীর হাতে একজন, মলম পার্টির হাতে একজন, রাজনৈতিক কারণে একজন খুন হন। এ ছাড়া গণপিটুনিতে একজন ও যৌতুকের দাবিতে একজন খুন হন।