ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল মাঠে বড় পর্দায় বিশ্বকাপ খেলা দেখতে গিয়ে হল সংসদ নেতার হেনস্তার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন সাবেক ছয় শিক্ষার্থী।
ঘটনার বিষয়ে গতকাল শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বরাবর অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। এ ছাড়া এই ঘটনায় গতকাল হল প্রাধ্যক্ষ বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে হল শাখা ছাত্রদল। ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী।
অভিযোগকারীদের একজন মুহতাসিন বিল্লাহ ইমন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার ভাষ্য, গত শুক্রবার রাতে নরওয়ে-ফ্রান্সের খেলা দেখতে তিনিসহ সাবেক ছয় শিক্ষার্থী হলের রেজিস্টার খাতায় নাম লিখে বৈধভাবে মাঠে গিয়েছিলেন। তারপরও হলের একদল শিক্ষার্থী তাদের ঘিরে ধরেন। মাঠ ছাড়তে চাপ দেন। সঙ্গে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী নারীকে হেনস্তা করেন। হেনস্তাকারীদের মধ্যে হল সংসদের সমাজসেবা সম্পাদক মো. সাজু মিয়া ছিলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এদিকে হেনস্তার অভিযোগ অস্বীকার করেন হল ছাত্র সংসদের সমাজসেবা সম্পাদক সাজু মিয়া। তবে সাজু স্বীকার করেছেন যে তারা ওই সাবেক শিক্ষার্থীদের হল থেকে বেরিয়ে যেতে বলেছেন। ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাথে সম্পৃক্ততার কথাও স্বীকার করেছেন তিনি।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ফেসবুক গ্রুপে এক পোস্টে মুহতাসিন বিল্লাহ ইমন লিখেছেন, ‘খেলা দেখা জন্য তারা ছয়জন শহীদুল্লাহ হলে যান। নিয়মানুযায়ী হলের রেজিস্টার খাতায় নাম লিখে প্রবেশ করেন। খেলা শুরুর আগেই তারা গিয়েছিলেন। তাই তারা মাঠে বসে আড্ডা দিচ্ছিল। হঠাৎ চারজন শিক্ষার্থী আসেন। তাদের জিজ্ঞেস করেন, তাঁরা ক্যাম্পাসের কি না। প্রাক্তন শিক্ষার্থী পরিচয় দেন তারা।’
শিক্ষার্থীদের একজন বলে ওঠেন, ‘আপনারা কোন লজিকে একটা মেয়ে নিয়ে ছেলেদের হলে খেলা দেখতে আসছেন?’ পরে আরও ৮-৯ জন এসে তাদের ঘিরে ধরেন। হল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য চাপ দেন। তাদের মধ্যে একজন নিজেকে হল সংসদের সমাজসেবা সম্পাদক (সাজু মিয়া) বলে পরিচয় দেন। তাদের চলে যেতে বলেন। সে সময় একজন সবার ছবি তুলে হলের ফেসবুক গ্রুপে পোস্ট করে দেওয়ার হুমকি দেন।’
তখন কথা বলতে গেলে সাজু উচ্চ স্বরে, খুবই উগ্রভাবে বলেন, ‘আপনাদের আর ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন মনে করি না। আপনারা এখন উঠেন আর বের হয়ে যান, এখানে মেয়ে নিয়ে থাকা যাবে না।’
তাদের সঙ্গে থাকা একজন বলেন, ‘ভাইয়া, তুমি যাকে মেয়ে মেয়ে বলছ, সে আমার স্ত্রী।’ বিষয়টি নিয়ে তারা হল সংসদের সিনিয়রদের সঙ্গে কথা বলতে চান। তখন সাজু বলেন, ‘আপনাদের সাথে কোনো কথা নাই, আপনারা উঠেন আর বের হয়ে যান।’
তাদের বের করে দিলে হল গেটে তারা অপেক্ষা করেন। পরে হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) তৌকির হাসান ঘটনার মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করেন। সাজুকে ঘটনাস্থলে আনার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। হল সংসদের জিএস প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করেন। প্রভোস্ট বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন।
হেনস্তার অভিযোগ নিয়ে সাজু গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা তাদেরকে ভালোভাবে চলে যেতে বলি। তারা উল্টো আমাদের উপর রেগে যায়। আমরা মেয়ে নিয়ে কোনো কথায় বলি নাই।’
নারীকে হেনস্তার বিষয়ে সাজু মিয়া বলেন, ‘আমি একদম চ্যালেঞ্জ করতে পারি, যদি ওই আপু বলতে পারেন যে তার সাথে একটা সিঙ্গেল ওয়ার্ড আমার বিনিময় হইছে, তাহলে অবশ্যই আমি আপুর কাছে ক্ষমা চাইব।’
এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে সুফিয়া কামাল হল সংসদের ভিপি সানজানা চৌধুরী রাত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়ে কর্মসূচির ঘোষণা দেন।
কর্মসূচিতে বলা হয়েছিল, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরা রোববার সকাল আটটার আর্জেন্টিনা-জর্ডান ম্যাচ একসঙ্গে শহীদুল্লাহ হল মাঠে বসে দেখবেন। ম্যাচ শেষে তারা প্রক্টর অফিসে স্মারকলিপি দেবেন।’
সে অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের সুফিয়া কামাল হলের একদল শিক্ষার্থী আজ রোববার সকালে আর্জেন্টিনার ম্যাচের সময় শহীদুল্লাহ হলের খেলার মাঠে অবস্থান নেন এবং একসঙ্গে শহীদুল্লাহ হল মাঠে বসে খেলা দেখেন।
এ বিষয়ে সুফিয়া কামাল হল সংসদের ভিপি সানজানা চৌধুরী রাত্রী বলেন, ‘পরে সেখান থেকে প্রক্টরের কাছে এ ঘটনাসহ নারী হেনস্তা প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্মারকলিপি দিয়েছি। একই সঙ্গে এ ঘটনায় জড়িতদের যেন বিচারের আওতায় আনা হয় সে দাবি জানিয়েছি।’
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ইসরাফিল রতন বলেন, ‘লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি তদন্ত করতে একজন সহকারী প্রক্টরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলের প্রাধ্যক্ষের কাছে স্মারকলিপি দেয় হল শাখা ছাত্রদল
শহীদুল্লাহ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, ‘সাবেক শিক্ষার্থীকে হল থেকে বের করে দেওয়ার কোনো এখতিয়ার হল সংসদের নেই। এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব হল প্রশাসনের।’ বর্তমান বা সাবেক শিক্ষার্থীদের প্রবেশের বিষয়ে আলাদা কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি বলেও জানান তিনি।