উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ইরান অন্য কোনো দেশের কাছে হস্তান্তর করতে রাজি নয় বলে জানিয়েছেন দেশটির একজন ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা। রবিবার (২৪ মে) বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ তথ্য জানান।
সূত্রটি জানিয়েছে, তেহরান তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ হস্তান্তরে রাজি নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া প্রাথমিক চুক্তির অংশে ইরানের পারমাণবিক বিষয়টি ছিল না। পারমাণবিক বিষয়টি চূড়ান্ত চুক্তির জন্য আলোচনায় উত্থাপন করা হবে। তাই এটি বর্তমান চুক্তির অংশ নয়। ইরানের উচ্চসমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ দেশ থেকে বাইরে পাঠানোর বিষয়ে কোনো চুক্তি হয়নি বলে যোগ করে সূত্রটি।
এর আগে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি স্পষ্ট নির্দেশনা জারি করেন যে, কোনো অবস্থাতেই ইরানের এই যুদ্ধোপকরণ মানের কাছাকাছি থাকা ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠানো যাবে না।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো মূল্যে ইরানের এই ইউরেনিয়াম মজুদ উদ্ধার ও ধ্বংস করবে। তবে নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ইরান এই ইউরেনিয়াম সমর্পণে রাজি হয়েছে, যা এখন ইরান সূত্র সরাসরি অস্বীকার করল।
এদিকে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, দেশের কোন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সর্বোচ্চ নেতার অনুমোদন ছাড়া নেওয়া হবে না। শনিবার আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজের বরাতে এই তথ্য জানা গেছে।
এই বক্তব্য এমন সময় এলো, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, ইরানের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য শান্তিচুক্তিতে পৌঁছাতে ‘বহুলাংশে আলোচনা সম্পন্ন’ হয়েছে। পেজেশকিয়ান আরও স্পষ্ট করেছেন, ইরানের সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দেশের সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ ‘সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল’-এর কাঠামোর মধ্যেই নেওয়া হবে। এই কাউন্সিলই ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা নীতিনির্ধারণের প্রধান সংস্থা। তার এই মন্তব্যকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ নেতৃত্বের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ পুনরায় জোরালোভাবে তুলে ধরার একটি বার্তা হিসেবে দেখছেন।
যদিও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি মার্চ মাসে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে প্রকাশ্যে দেখা দেননি। এতে তার শারীরিক অবস্থা ও অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন ধরনের জল্পনা তৈরি হয়েছে। এই অনিশ্চয়তার পেছনে আরও একটি বড় প্রেক্ষাপট হলো- যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় তার বাবা ও পূর্বসূরি আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর ক্ষমতার কেন্দ্রীয় কাঠামোতে পরিবর্তনের আশঙ্কা তৈরি হয়।
এর আগে চলতি মাসে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, মোজতবা খামেনি একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডারের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তবে সেই বৈঠকের কোন ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করা হয়নি, যা নিয়ে আরও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের সাম্প্রতিক মন্তব্য ইরানের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে, তাহলো- দেশের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা এখনও সর্বোচ্চ নেতার হাতে কেন্দ্রীভূত এবং জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত যেকোন আলোচনা সেই কাঠামোর বাইরে যাবে না। একই সঙ্গে ট্রাম্পের সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি দাবির প্রেক্ষাপটে ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা কাঠামো নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ আরও তীব্র হচ্ছে। সব মিলিয়ে ইরানের নেতৃত্ব, নিরাপত্তা সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক সমীকরণ-এই তিনটি বিষয়ই বর্তমানে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে