শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬, ০১:১৭ অপরাহ্ন

অর্থনীতিতে জ্বালানি সংকটের অভিঘাত, উত্তরণের পথ

জিয়াউর রহমান
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৪ মার্চ, ২০২৬
  • ৫ বার

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংঘাত দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। সহসা এই সংঘাত বন্ধ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। বরং পরিস্থিতির আরও অবনতি হচ্ছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা তীব্রতর করেছে। ইতোমধ্যে দেশটির একটি বড় তেল শোধনাগার জ্বালিয়ে দিয়েছে, ধ্বংস করা হয়েছে অসংখ্য অবকাঠামো। নিরীহ স্কুল শিক্ষার্থীসহ হাজারেরও অধিক মানুষ এসব হামলায় নিহত হয়েছে। অস্তিত্ব রক্ষায় মরিয়া ইরানও পাল্টা জবাব দিচ্ছে। শুধু ইসরায়েলে নয়, মধ্যপ্রাচ্যে থাকা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহারাইনে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে ইরান। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ওপর চাপ তৈরি করতে কৌশলগত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে দেশটি। এই প্রণালিতে অসংখ্য মাইন বসানো হয়েছে। এ ছাড়া নিষেধাজ্ঞা অমান্য করায় এক ডজনেরও বেশি জাহাজে ইরান হামলা করেছে, তাতে বেশ কিছু হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে।

মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনায় অস্থির হয়ে উঠেছে বিশ্বের জ্বালানি বাজার। ক্রুড তথা অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৭০ ডলার থেকে ১০০ ডলারে উঠে গেছে। ইরান হুমকি দিয়েছে, তাদের ওপর হামলা বন্ধ না করলে এই তেল ২০০ ডলারে কিনতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে হরমুজ প্রণালি বন্ধ না রাখতে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে; বলেছে, এই প্রণালি খুলে না দেওয়া হলে দেশটির ওপর চরম আঘাত হানা হবে। তবে ইরান এই হুঁশিয়ারিকে কোনো পাত্তাই দিচ্ছে না। পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি-ধমকিতে তেমন কাজ হবে না। এখনও প্রণালিটির ওপর ইরানের শতভাগ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং এই নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার মতো প্রস্তুতিও তাদের আছে। তাতে জ্বালানি তেল ও এলএনজির দাম যে সহসা কমবে না, বরং আরও বাড়তে পারে- এমন আশঙ্কাই প্রবল হয়ে উঠছে।

জ্বালানি তেল ও এলএনজির বাজারে হরমুজ প্রণালির বড় ধরনের প্রভাব রয়েছে। কারণ এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ৩০ শতাংশ (যার দৈনিক পরিমাণ প্রায় ২ কোটি ব্যারেল) এবং এলএনজির প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন করা হয়। এ প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল রপ্তানির প্রধান পথ এটি। এই জলপথ বন্ধ থাকলে তাই বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহ সংকট তৈরি হয়, যার প্রভাবে তরতর করে বাড়তে থাকে দাম।

ইরান সংঘাতের দুই ধরনের প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহের ওপর। প্রথমত, বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও জ্বালানি তেলের ২০ শতাংশের বেশি হরমুজ প্রণালি হয়ে আসে। এলএনজির ক্ষেত্রে এই হার আরও বেশি, প্রায় ৬০ শতাংশের মতো। তাই দেশে জ্বালানি তেল ও এলএনজির সরবরাহ কমে গেছে। অন্যদিকে সংকটের তীব্রতা এড়াতে সরকারকে স্পট মার্কেট থেকে উচ্চ মূল্যে তেল কিনতে হচ্ছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার মজুদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। ঢাকা চেম্বারের এক তথ্য মতে, জ্বালানি তেলের দাম ১০ ডলার বাড়লে মাসে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় ৮ কোটি ডলার বাড়তে পারে। ইতোমধ্যে ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম ৩০ ডলারের বেশি বেড়ে গেছে। এর অর্থ আমাদের মাসিক আমদানি ব্যয় বেড়েছে ২৪ কোটি ডলার। যদি তেলের দাম আর না-ও বেড়ে বর্তমান অবস্থায় বহাল থাকে তাহলেও বছরে আমদানি বাবদ বাড়তি প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার গুনতে হবে। আমাদের মতো ভঙ্গুর অর্থনীতির জন্য এটি একটি বড় ধাক্কা।

আমাদের ওপর ইরান সংকটের তাৎক্ষণিক ধাক্কা একটু বেশি লেগেছে। এর কারণ আমাদের স্বল্প মজুদ ও সরবরাহের সীমিত উৎস। উন্নত অর্থনীতি বাদ দিলেও আমাদের মতো অনেক দেশও আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েক মাসের জ্বালানি তেল মজুদ রাখে। আমাদের ৩৪ দিনের মতো মজুদ রাখার অবকাঠামোগত সক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে মজুদ থাকে অনেক কম। বর্তমানে পেট্রল ও অকটেনের মজুদ ২৮ দিনের মতো থাকলেও ডিজেলের মজুদ আছে মাত্র ১২ থেকে ১৪ দিনের। অথচ আমাদের মোট জ্বালানি চাহিদার ৭০ শতাংশই হচ্ছে ডিজেল। বাস, ট্রাক, ট্রেনসহ গণপরিবহনের বড় অংশই ডিজেলচালিত। শিল্প-কারখানা ও আবাসিক ভবনে ব্যবহৃত জেনারেটরের শতভাগ ডিজেলে চলে। কৃষির সেচযন্ত্রসহ অন্যান্য যন্ত্রও ডিজেলনির্ভর। এ ছাড়া কয়েকটি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রও ডিজেল দিয়ে পরিচালিত হয়।

উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে জ্বালানি তেল বিক্রিতে রেশনিং শুরু করেছে। বেঁধে দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ সীমা। তাতে সাময়িকভাবে সংকটের তীব্রতা কিছুটা প্রশমিত হলেও অর্থনীতিতে নানা মাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। শিল্প-কারখানায় গ্যাস-তেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। লোডশেডিং বেড়ে গেছে। এতেও উৎপাদন কমছে।

জ্বালানি সংকট দেশের রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য হুমকি তৈরি করেছে। একদিকে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সময়মতো বিদেশি ক্রেতার কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়া ঝুঁকিপুর্ণ হয়ে উঠছে, অন্যদিকে কাঁচামাল আমদানির ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে পণ্য উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে। তাতে কমছে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা। এ ছাড়া জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ধীরগতি এবং বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় রপ্তানি পণ্যের চাহিদাও কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাবে ২০২২ সালে বিশ্ব উচ্চ মূল্যস্ফীতির কবলে পড়ে। এর মধ্যে অনেক দেশে মূল্যস্ফীতি কমে অনেকটা স্বাভাবিক অবস্থায় চলে এলেও বাংলাদেশে এর অনেকটাই ব্যতিক্রম। কয়েক বছর ধরে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবন দুঃসহ হয়ে উঠেছে। গত বছরের শেষ দিক থেকে মূল্যস্ফীতি একটু কমার দিকে এগোচ্ছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে সেটি আবার বেড়ে যেতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে বাজারে ভোগ্যপণ্যসহ নানা ধরনের পণ্যের মূল্য ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। এই ধারা চলতে থাকলে সাধারণ মানুষই শুধু আরও কঠিন অবস্থায় পড়বে না, অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে শিল্প খাতও সমস্যায় পড়বে। একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের ফলে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা বেসরকারি বিনিয়োগে গতি সঞ্চারের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, সেটিও ভেস্তে যাবে। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে খরা না কাটলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে না। বরং জ্বালানি অভিঘাতে কয়েক লাখ মানুষ কাজ হারাতে পারে।

আমাদের গ্যাসের চাহিদার প্রায় ৩০ ভাগ আমদানিকৃত এলএনজির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। সরবরাহ সংকটে বেসরকারি খাতসহ কিছু খাতে গ্যাসের সরবরাহ ঠিক রাখার জন্য সার কারখানাগুলোতে গ্যাস দেওয়া যাচ্ছে না। দেশের ছয়টি সার কারখানার মধ্যে পাঁচটিই এখন বন্ধ। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় ইউরিয়াসহ অন্যান্য সার আমদানিতেও সংকট দেখা দেবে। সারের অভাবে কৃষিতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। উৎপাদন কমে গেলে হুমকিতে পড়বে খাদ্য নিরাপত্তা।

জ্বালানি তেল রেশনিংয়ের কারণে ইতোমধ্যে গণপরিবহন চলাচল কমে গেছে। তেলের অভাবে চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দরে মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাস করতে পারছে না বেশির ভাগ লাইটারেজ জাহাজ। অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহনও ব্যাহত হচ্ছে। সব মিলিয়ে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে জ্বালানি সংকটের অভিঘাত লেগেছে।

অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা না নেওয়ার কারণে এবার দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এতটা নাজুক অবস্থায় পড়েছে। অনেক বছর ধরেই জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য জ্বালানি তেলের মজুদ সক্ষমতা বাড়ানো, তেল কেনার উৎস বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক গ্যাসের অনুসন্ধান বাড়ানো, জ্বালানি দক্ষতার উন্নয়ন এবং সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি-বিদ্যুতে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুপারিশ করে আসছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু অতীতের সরকারগুলো মুখে অনেক কথা বললেও বাস্তবে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বরং আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সরকারের প্রশ্রয়ে থাকা ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটকে এলএনজি বাণিজ্যের সুবিধা করে দিতে নিজ দেশে প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধানের কার্যক্রম একপ্রকার বন্ধ করে দেওয়া হয়। বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন জোন থেকে ভারত ও মিয়ানমার বিপুল গ্যাস উত্তোলন করলেও আমরা এ সুযোগ একেবারেই কাজে লাগাইনি। গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও রাজনৈতিক সংস্কারে যত মনোযোগ ছিল, তার ছিটেফোঁটাও ছিল না জ্বালানি খাতের উন্নয়নে। সরকার রিজার্ভ বাড়িয়ে বাহবা নেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু জ্বালানি তেলের একটি নিরাপদ মজুদ রেখে যাওয়ার সামান্যতম চেষ্টা করেনি। এ কারণে বর্তমান সরকার বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে গেছে। তা ছাড়া সরকারের মেয়াদ এখনও এক মাস পূর্ণ হয়নি। তারা সবকিছু বুঝে নেওয়ার আগেই বড় ঝাপটা এসে গায়ে লেগেছে।

সরকার রেশনিংয়ের পাশাপাশি তাৎক্ষণিকভাবে সংকট প্রশমিত করতে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে স্পট মার্কেট থেকে যেকোনো দামেই হোক না কেন পর্যাপ্ত তেল ও এলএনজি কেনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেশী ভারতকে বাড়তি ডিজেল সরবরাহ করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। প্রথমবারের মতো রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। দেশটির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থাকায় তেল আমদানিতে তাদের ছাড় চাওয়া হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য সংকট হয়তো আগামী কয়েক মাসের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু এমন সংকট আবারও দেখা দিতে পারে, মধ্যপ্রাচ্যে না হোক, অন্য অঞ্চল ঘিরে। তাই অতীতের মতো এবারও যেন আমরা সংকট উত্তরণের পরই সব ভুলে না যাই। নতুন সরকারের উচিত হবে জ্বালানি নিরাপত্তার ইস্যুটিকে তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখা। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে একদিকে মজুদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে, পাশাপাশি বাড়াতে হবে উৎস। প্রাকৃতিক গ্যাসের অনুসন্ধানে উদ্যোগ ও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন সম্ভাবনাময় ব্লকে গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশি কোম্পানিকে আমন্ত্রণ জানাতে হবে। বাড়াতে হবে আমাদের সব ধরনের জ্বালানি দক্ষতা। কমিয়ে আনতে হবে অপচয় ও দুর্নীতি। সৌরবিদ্যুৎসহ অন্যান্য বিকল্পের প্রতি মনোযোগ বাড়াতে হবে।

জিয়াউর রহমান : সাংবাদিক ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষক

মতামত লেখকের নিজস্ব

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ